আমি রোকশানা। আমার বার বারই মনে হয় যে, মেয়েদের সর্বনাশ করতে খুব নীরবে ভয়ানক এক মানসিক ভাইরাস ছড়িয়ে পরেছে আমাদের সমাজে। লক্ষ লক্ষ মেয়ে এই ভাইরাসের স্বীকার হয়ে রোজই কষ্ট পাচ্ছে। বাধ্য হচ্ছে নিজের স্বাভাবিক সৌন্দর্য বর্জন করে অন্য রকমভাবে তৈরী করতে। এই ভাইরাসের নাম জিরো ফিগার ।
মেয়েটা মোটা, তাই মেয়ের বিয়ে হয় না। মেয়েটা মোটা বলে তাকে মুটকি,
ভোটকি, হাতি, জলহস্তী এই সব কুৎসিত নামে ডাকা হয়। তার মানে কি মেয়েটা মোটা বলে, সে সুন্দর না? সমাজ তাকে সান্তনা দেবার জন্য বড়জোর সুইট, কিউট বলে ডাকে।
ভোটকি, হাতি, জলহস্তী এই সব কুৎসিত নামে ডাকা হয়। তার মানে কি মেয়েটা মোটা বলে, সে সুন্দর না? সমাজ তাকে সান্তনা দেবার জন্য বড়জোর সুইট, কিউট বলে ডাকে।
স্কুলে, কলেজে, ফাস্টফুডে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সবাই মোটা মেয়েটার খাওয়ার দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকায়। ভাবখানা এমন যেন মোটা মেয়েটা সব খাবার একাই খেয়ে ফেলবে।
সুযোগ পেলেই সবাই চিকন হবার জন্য একগাদা উপদেশ দিয়ে বসে সেই মেয়েটাকে। মোটা মেয়েটার মায়ের কানে কানে বলে, “ইয়ে ভাবী মেয়েকে জিমে পাঠান, রোজ সকালে হাটতে বলুন। নাইলে তো বিয়ের সময় অনেক সমস্যা হবে!”
কেউ যদি মোটা মেয়ে বিয়ে করে তবে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীদের কানাঘুষা করা শুরু করে। “জানিস! উমুক দেখতে কত সুন্দর, কিন্তু বউটা যেন কেমন! বউটা দেখতে ভাল, কিন্তু যে মোটা!” এখন মেয়েটার কি এটাই দোষ যে সে মোটা? তার মানে তারা বার বার মনে করিয়ে দেয় মোটা মেয়েরা দেখতে যতই সুন্দর হোক, আসলে সুন্দর না।
মেয়েটি যতোই উচ্চ শিক্ষিত, গুণবতি বা মেধাবী হোক না কেন, তার একটাই অপরাধ সে মোটা। বাবা মায়ের ঘুম হারাম হয়ে যায়, আত্মীয়রা মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজতে গেলে মোটা ছেলে খোঁজে। তাদের সবারই বদ্ধমূল ধারণা, এই মেয়েকে কোন চিকন ছেলে বিয়ে করবে না। শুধু চিকণ কেন, কোন ভাল ছেলেও বিয়ে করবে না। তাই যেমন তেমন একটা ছেলে পেলেই সবাই খুশি হয়ে বলে, “ছেলেটা হাতছাড়া হবার আগেই বিয়ে দাও।”
বাধ্য হয়েই মেয়েরা এখন নিজেদের চিকণ বানাবার রেসে সামিল হয়েছে। জিমের ছাঁচে ফেলে নিজের তুলতুলে শরীরটাকে, দুই লিটারের কোকের বোতল বানাবার জন্য উঠেপড়ে লাগে।
প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। স্বাভাবিক ভাবেই কেউ পাতলা, কেউ মোটা, কেউ মাঝারি, খাট বা লম্বা হয়। কেউ একটু ভোজন রসিক বলে স্থুল স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে যায়, সেটাও সুন্দর। অথচ জিরো ফিগার কিংবা স্লিম ফিগার না হলে মেয়েটা সুন্দর না, এমন একটা ফালতু ধারণা সবার মনেই ঢুকে গেছে।
আমাদের পূর্বজ, মা, খালা, দাদী নানীদের মধ্যে অনেকেই বিয়ের আগে মোটা ছিল, তার মানে কি তারা কুৎসিত ছিল? তাদের আবেদন কম ছিল?
মোটেও না, বরং তাদের স্থুল শরীর, ভরাট গাল, আংগুলের ভাঁজ, লম্বা চুল থেকে মুগ্ধ হতেই হত সবার। খুব সাদামাটা সাঁজেও তাদের অনেক সজীব, অনেক আকর্ষণীয় মনে হত।
মোটা শরীরের জন্য ক্ষতিকর মানছি। কিন্তু কেউ যদি মোটা হয়ে খুশি থাকে তবে তাকে থাকতে দিন না? আপনাদের এতো অসুবিধা কেন? আপনার নিজের বোন বা মেয়ে যদি মোটা হতো, তবে আপনিও কি এমনটায় ভাবতেন? এমনভাবেই তাকে ধীৎকার করতেন?
বাদ দেন। আপনার বোন বা মেয়ের মোটা হওয়ার দরকার নাই। আপনি যদি মোটা হতেন, তবে আপনার সাথে যদি এমন হতো তখন কি করতেন? সহ্য করতে পারতেন? প্রশ্নগুলো আপনার কাছে রইল। আর যদি পারেন তবে নিজের দৃষ্টিভোঙ্গী পরিবর্তন করেন। তবেই দেখবেন আমাদের সমাজটা কত সুন্দর, আমাদের সমাজের সব মেয়েটা কত সুন্দর। চাই সে মোটা হোক চাই চিকন।

No comments:
Post a Comment