আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি কোন বিপনি বিতানের পণ্য আর আমার বাসাটা হল সেই বিপনি বিতান। যেখানে আমাকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত, বাবা-মা পন্য হিসাবে প্রস্তুত করেন। পরে পণ্য হিসাবে বিভিন্ন ছেলে বা তার অভিভাবকের সামনে উপস্থাপন করা হয়। খুব খারাপ লাগে নিজেকে অনেক ভাল মেয়ে হিসাবে উপস্থাপন করতে। সত্যিই কি আমি তাই? একদম না, কোন দিনও না। কারণ আমি ছোট থেকেই যে অনেক চঞ্চল। একটু ডানপিঠে স্বভাবের ছিলাম।
আমি বর্তমানে অনার্স ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী। সেই এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে আমাদের বাসায় বিভিন্ন সময় অপরিচিত মানুষ আসতো, এখনো আসছেই। সবসময় দেখতাম কোন এক বা একাধিক ছেলে, আবার অনেক সময় বয়স্ক পুরুষ বা মহিলা। কখনো বা বেশ কিছু মানুষ। তাদের নিয়ে বাসায় যেন হুলুস্থুল পরে যেত। মনে হয় যেন বাসায় প্রধানমন্ত্রী চলে এসেছে। আমাকে তাদের সামনে নিয়ে যাওয়া হত সাজিয়ে গুজিয়ে। প্রথম প্রথম কিছু বুঝতে না পারলেও, এখন নিজেকে বিপনি বিতানের পণ্যের মতই মনে হয়।
তেমনই এক অভিজ্ঞতার কথা বলি।
আমি তখন সবে এইচএসসি ১ম বর্ষের ছাত্রী। একদিন কলেজ থেকে আসার পর আম্মু আমাকে অনেক আদর করে ডেকে বলল, “যাও গোসল করে নাও। আর গোসল করে ঘুমিয়ে পরবে। ঠিক আছে।” আম্মুর এমন ব্যবহার দেখে তো আমি হতবাক। মনে মনে চিন্তা করলাম, আজ কি কোন অঘটন ঘটিয়েছি? নাকি আমার বিরুদ্ধে বাসায় এসে কেউ কিছু বলে গেছে? না! কোন দিক দিয়েই যেন হিসাবটা মিলাতে পারছিলাম না। ভাবলাম হয়তো আম্মুর আজ মনটা অনেক ভাল, তাই এতো আদর করে কথা বলছে।
গোসল করার পর বসে বসে টিভি দেখছিলাম। আম্মু হটাৎ এসে রাগান্বিত হয়ে বলল, “তোমাকে গোসল করে ঘুমাতে বললাম না? তুমি টিভি দেখছো কেন?” কিছু বলার আগেই আম্মু হাতে থেকে টিভির রিমোর্টটা নিয়ে টিভি বন্ধ করে আমাকে আমার রুমে পাঠিয়ে দিল।
কি আর করার। বাধ্য হয়েই ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম থেকে উঠলাম আব্বুর খুব নরম গলার স্বরে। আমাকে আব্বু এমনিতে কখনই বকাবকি করে না। কিন্তু সেদিনে ডাকাটা যেন একেবারেই অন্যরকম ছিল। আমাকে ঘুম থেকে আব্বু উঠানোর পর আমার ঘরে দেখি আম্মুও আছে। আম্মু আমাকে ঘরের এ্যাটাচ বাথরুমটা দেখিয়ে বলল , “যাও মুখ হাত পা ভালভাবে ধুয়ে আসো।” বিছানার পাশে থাকা একটা নতুন ড্রেস দেখিয়ে আমাকে বলল, “তারপর এই ড্রেসটি পড়ে নিও।”
নতুন ড্রেস দেখে তো আমার আনন্দের সীমা নাই। আমি আবেগ আপ্লুত হয়ে একটু উচু স্বরেই আব্বুকে বললাম, “আমরা কি কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি?”
আম্মু খুব কড়া গলায় কিন্তু নিচু স্বরে আমাকে বলল, “আস্তে কথা বল।”
আমি তখন আম্মুকে বললাম, “আমি তো সবসময় বাইরের বাথরুমে ফ্রেশ হই, আমি ওখানেই ফ্রেশ হব।”
আব্বু আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “তোমার আম্মু যা বলছে, তাই করো মা। এতো জেদ ভাল না। বাসায় মেহমান এসেছে তো, তাইরে এখানে ফ্রেশ হয়ে নাও!
খুব রাগ হচ্ছিল আব্বু-আম্মু দু’জনের উপরেই। কিন্তু কোন উপায় না দেখে এ্যাটাচ বাথরুমেই ফ্রেশ হলাম। বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখি আম্মু এখনো আমার ঘরে। আমার রাগ যেন মাথায় উঠে গেছে। চিল্লাতে যাচ্ছিলাম, আম্মু আমাকে আবারও বাসায় মেহমানের কথা মনে করিয়ে দিল। আমি ড্রেসটা পড়লাম। খালা এসে আমাকে সুন্দর করে সাজাতে শুরু করল।
তখনো বুঝিনি কি হচ্ছে এসব। কারণ, রাগে আমার মাথা কোন কাজ করছিল না। তারপর খালা সাজাতে সাজাতে আমাকে বোঝাতে শুরু করল, “পাশের ঘরে তোমাকে দেখতে একটি ছেলে ও তার বাবা-চাচাসহ ৩-৪ জন। তুমি কিন্তু রাগ করে কথা বলবা না। যা জিজ্ঞাসা করবে ঠিক ঠিক জবাব দিবা। কোন কিছু রান্না করতে পার কিনা জানতে চাইলে বলবা, তুমি সব রান্না করতে পার। আর আসতে আসতে হাঁটতে হাঁটতে যাবা আবার আসবা। আর মাথা নিচু করে বসে থাকবা”
কথাগুলো শোনার পর মাথা যেন গুলিয়ে গেল। আমাকে দেখতে আসছে? আবার আমাকে মিথ্যা বলতে বলছে খালা? আমি খালাকে জিজ্ঞাসাই করে বসলাম এসবের মানে কি? খালা তখন বলল, “তোমার বিয়ের কথা চলছে ঐ ঘরে বসে থাকা নেভী ব্লু কালারের শার্ট পড়া ছেলেটার সাথে। ঐ ঘরে ঘুকার সময় সালাম দিয়ে ডুকবা। ও হ্যা, তুমি আমার কোন কিছু জিজ্ঞাসা করে বসো না! আর তোমার আম্মু যা দিবে তার মধ্যে চা টা সবাইকে তুলে দিও। ”
এবার তো মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ার মত অবস্থা। আমার বিয়ে? তাও আবার অপরিচিত একজনের সাথে, যাকে আমি চিনি না পর্যন্ত! আবার তার সম্পর্কে জানতেও পারব না! মাথার মধ্যে এই সব ঘুরপাক খেতে খেতেই আম্মু আমার হাতে আঙ্গুর, কমলা, বিস্কুট, পিয়াজু, চা সাজানো ট্রে দিয়ে বলল, “তোমার খালা যেভাবে বলেছে সেভাবে কথা বলবা।”
ঘরে ডুকতেই সব অপরিচিত মানুষগুলো আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল যে, আমি অনেক নার্ভাস হয়ে গেলাম। আর একটু হলে তো হাতে থাকা ট্রেটা দেখতে আসা ছেলেটার গায়ের উপরই পড়ে যেত। যেভাবেই হোক নিজেকে কন্ট্রল করে নিলাম যখন দেখলাম ঘরে আব্বু ও খালু আছে। তবুও হাত কাঁপছিল। ট্রেটা মাঝে রাখা টেবিলের উপর রেখে সবাইকে চায়ের কাপ তুলে দিলাম। তখনো নার্ভাস। ছেলের সাথে আসা একজন আমাকে বসতে বলল।
আমাকে বসতে বলার ভঙ্গি দেখে আমার খুব মেজাজ খারাপ হয়েছিল। মনে হচ্ছিল, আমার বাসায় এসে আমাকেই বসতে বলে! মনে হচ্ছিল লোকটার বের হয়ে থাকা দাঁতগুলো ঘুসি মেরে ভেঙ্গে দেই। কিন্তু যতই হোক বাসার অতিথি তো। ছোটবেলা থেকেই শিখেছি, অতিথিদের অপমান করতে নেই।
তারপর বসলাম। বসার পর মাথা নিচু করে বসে ছিলাম। তারপরও বুঝতে পারছিলাম, সবাই আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তখন মনে হচ্ছিল আমি কোন দোকানে টাঙ্গানো কাপড়, আর এরা আমাকে দেখছে। খুব বিব্রত বোধ করছিলাম।
তারপর আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেছিল তারা, আমি রান্না করতে পারি কিনা, কোরআন পড়তে পারি কিনা, নামাজ পড়ি কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। খালার শেখানো কথা মত সব মিথ্যা বলে যাচ্ছিলাম। আমি তো জানি, আমি কিছু কিছু জিনিস ছাড়া সব রান্না করতে পারিনা। আর নামাজও ঠিকমত পড়িনা, কিন্তু পুরায় চাপা পিটিয়ে যাচ্ছিলাম। সাথে মেজাজটাও খারাপ হচ্ছিল।
সবচেয়ে মেজাজ খারাপ হয়েছিল যখন ছেলেটি আমাকে প্রশ্ন করেছিল, আমার কারো সাথে সম্পর্ক আছে কিনা। আরে বেটা আমার যদি কারো সাথে সম্পর্ক থাকতো তবে কি তোর সামনে এভাবে এসে বসতাম। মেজাজ খারাপ করেই বলেছিলাম, “আমার তো নাই, আপনার কয়টা মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে?”
এই কথা শুনে দেখতে আসা সবার মুখ বন্ধ। আমাকে বিদায় করে দিয়েছিল রুম থেকে। পরবর্তীতে সেই ছেলের সাথে আমার বিয়ে হয়নি। কিন্তু রুম থেকে বের হওয়ার পর থেকে কতদিন যে আমাকে এই কথার জন্য আম্মুর কাছে কথা শুনতে হয়েছিল তার ঠিক নাই। মাঝে মাঝে মেজাজ গরম করে আম্মুকে বলতাম, “এতই যখন ছেলেটাকে পছন্দ হয়েছিলো, তো হাত পা ধরে বিয়ে দিয়ে দিতা।”
এমন অনেক ছেলেই আমার বাসায় এসেছে, আমাকে দেখে গিয়েছে। কিন্তু কারো সাথে আমাকে আলাদা কথা বলার সুযোগ দেয় নি আমার পরিবার বা ঐ ছেলের পরিবার। তাই বাধ্য হয়েই নিজের অজান্তেই জানতে চাইতাম ছেলেটির সম্পর্কে। তার ফলে তো সবাই আমাকে “মুখ কাটা মেয়ে” উপাধি দিয়ে দিয়েছে আমরা মেয়েরা কি নিজেদের মতামত জানানোর কোন অধিকার নাই। কোন ছেলে যদি আমাকে নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে তবে আমি কেন পারব না সেই ছেলেটির সম্পর্কে জানতে যে, ছেলেটির কোন মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে কিনা, ছেলেটা কি চাকুরী করে, ছেলেটা কোন মাদকের আসক্ত কিনা?
আমরা মেয়েরা যেন অলিখিতভাবে সম্মতি দিয়ে যাচ্ছি সমাজের এই অব্যবস্থার উপর। আমরা মেয়েরা কি এই অব্যবস্থা ভেঙ্গে বের হয়ে আসতে পারি না।
পারি অবশ্যই পারি। শুধু আমাদের মানুসিকতাটা পরিবর্তন করলেই পারি।

No comments:
Post a Comment