Tuesday, 30 June 2015

আমরা কি শুধুই ভোগের পণ্য?

আমি ২২ বয়সী তরুণী। এদেশের অনেক মেয়ের মতোই আমার ২২ বছরের জীবনেও কিছু অভিশপ্ত অধ্যায় আছে। যেহেতু আমার বাবা মা দুজনেই কর্মজীবী ছিলেন তাই আমাকে ছোটকাল থেকেই কিছুটা একাকী থাকতে হয়েছে। জীবনে আমাকে চার চারবার যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়। এছাড়া ছোট খাটো ঘটনার কথা বাদই দিলাম। আমার এই ঘটনা গুলো বলার একমাত্র উদ্দেশ্য আপনারা মেয়েরা সচেতনতা হন।

প্রথম ঘটনা : জীবনে প্রথম আমার লেখা পড়ার হাতে খড়ি হয় আমার ভাইয়ার গৃহশিক্ষক স্যারের কাছে। ভাইয়াকে পড়তে দেখে আমিও খুব পড়ার জন্য জিদ করতাম। সেই স্যারই আমাকে পড়ান ক্লাস ৫ পর্যন্ত। আমি খুব স্যারের ভক্ত ছিলাম। 
যখন ক্লাস ৫ এ উঠার পর আমার বয়োসন্ধি হল, তখন স্যারের মুখোশ খুলে যায় ।
একদিন স্যার আমাকে জোড় করে শারীরিক নির্যাতন করে। প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করেছিলাম আমার গোপানাঙ্গে। ঠিকমত হাটতে পারছিলাম না। পরে  আমার বাবা-মা সব বুঝতে পেরে সাথে সাথে বিদায় করে স্যারকে। আর আমাকে বলে দেয়, আমি যেন কারো সাথে এই ঘটনা শেয়ার না করি। 
দ্বিতীয় ঘটনা : আগের ঘটনা থেকে আমার বাবা-মা যেন কোন শিক্ষায় নিতে পারেনি। ফলে তারা আবার একজন পরিচিত গৃহ শিক্ষক ঠিক করেন, যে আমাকে কাজিনদের পড়ান। তিনি নাকি তাদের অনেক বিশ্বাসী। বিশ্বাসী না ছাই। সবগুলা জানোয়ার। এই স্যারের কাছে আমি ক্লাস এইট থেকে টেন পর্যন্ত পড়েছি। এই তিন বছরে প্রায় প্রতিদিন বিভিন্নবাবে আমাকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কখন পড়া বোঝানোর ছুতায় আমার বুকে হাত দেয়া, গোপনাঙ্গে হাত দিত। আমার খুব খারাপ লাগতো। আমার সাথে বেশ কয়েকবার সে সেক্সও করে। এক সময় মনে হত, কেন সহ্য করেছি? কখনো সাহস হয় নাই কাউকে বলার। কারণ বললেই পরিবারে ছড়িয়ে পরবে, সবাই আমাকে নিয়ে কথা বলবে, আমার দিকে আঙুল তুলে কথা বলবে, আমি খারাপ মেয়ে। এইসব ভয়েই ছিলাম। পরিবারকে বোকার মতো ভয় পেয়ে আমাকে সহ্য করতে হয়েছে অবিশ্বাস্য নোংরামি আর অশ্লীলতা। যে কথা এখনো মনে হলে নিজের প্রতি ঘৃনাবোধ হয়। 
তৃতীয় ঘটনা: আমি এবার শারীরিকভাবে নিপীড়িত হই আমার কাজিনদের মধ্যে সবার প্রিয় বড় ভাইয়ের কাছে। ব্যাপারটা আমার জন্য খুব বেশ আশ্চর্যজনক ছিলো। মেনে নেয়াও কষ্টকর ছিলো। 
আমার চাচাতো বোনের বিয়ে অনুষ্ঠান। সব ভাই-বোনরা অনেক মজা করছিলাম একসাথে। গায়ে হলুদের রাত্রিতে সবাই একসাথে সারা রাত আড্ডা দিব আর গানের তালে নাচব বলে ঠিক করেছিলাম। সবাই ছাদের উপরে আমরা কাজিনরা। আর বয়স্ক যারা ছিলেন তারা সবাই বাসায় নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত। একসময় নাচতে নাচতে আমি ক্লান্ত হয়ে গেলে আমার সেই বড় ভাই ছাদের কোনায় থাকা ঘরটি দেখিয়ে আমাকে বলল, চল আমরা ওখানে বসে বসে সবার নাচ দেখি। ভাইয়া এতই ভাল ছিল যে, সবাই তার সব কথা শুনতো। কেউ কখন তাকে মানা করতো না। আমি সরল বিশ্বাসে তার কথায় রাজি হয়ে গেলাম। আমি ঘরে ডুকে চেয়ারে বসে ওদের নাচানাচি দেখছিলাম আর ভাইয়া পেছনে দাড়িয়ে ছিল। হটাৎ দেখি ভাইয়া তার হাত দিয়ে আমার বুক টিপছে। আমি চিৎকার করতে পারছিলাম না, কারণ এত জোড়ে গান বাজছিল যে, কেউ শুনেতে পাবে না। আমি ভাইয়া সরাতে গেলে ভাইয়া রুমে থাকা বিছানায় শুইয়ে আমাকে তার ভোগের পণ্য বানিয়ে যা ইচ্ছা তাই করেছিল। কিন্তু তারপরও কাউকে কিছুই বলতে পারিনি। কারণ কেউ বিশ্বাস করবে না। নিজেকে বোঝাতে লাগলাম মেয়েদের মেনে নিতে হয় অনেক কিছু, মেয়েদের মেনে নেয়া শিখতে হয়। 
চতুর্থ ঘটনা: আমি যখনও স্কুলে ভর্তি হয়নি। হবো হবে অবস্থা এমন সময় আমার চাচাতো ভাই হয়। ছোট থেকেই ভাইটাকে আমি খুব আদর করতাম,  কারণ সে দেখতে অনেক সুন্দর হয়েছিল। কোলে নিয়ে ঘুড়ে বেড়াতাম পাড়া পাড়া তাকে নিয়ে। ও বড় হলে আমার বাবা মা ওকে আমাদের বাসায় নিয়ে আসে রাজশাহীর নামকরা কলেজে ভর্তি করানোর উদ্দেশ্যে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! ২১ বছর বয়সের আমি একদিন মধ্যরাতে আমার পাশে ১৬ বছর বয়সী সেই ছোট ভাইয়ের উপস্থিতি বুঝতে পারি, সে আমার বুকে হাত দিয়ে টিপছে আর চেষ্টা করছে আমার কামিজ খোলার। তারপর যা হওয়ার তাই হল। অনেক মেরেছিলাম তাকে এই ঘটনা ঘটানোর পর। পরে সে ভুল বুঝতে পেরে আমার কাছে ক্ষমা চাই । ছোট ভাইয়ের প্রতি অন্ধ ভালোবাসায় কাউকে কিছু বলতে পারিনাই। কিন্তু তারপর থেকে প্রচণ্ড আতংকে আছি আমি। সবসময় মনে হয়, আমি কোথায় নিরাপদ? 

ভয়টা এখনো আমার কাটে নাই। যাদের সাথে এমন ঘটনা ঘটেনি তারা অনেক ভাগ্যবতি। কিন্তু যাদের সাথে ঘটেছে, শুধুমাত্রই তারাই জানে এর যন্ত্রনা কতটুকু। আমরা মেয়েরা কি শুধুই ভোগের পণ্য? আমাদেরকে কি মানুষ হিসাবে ভাবা যায় না? আমরা কি সারাজীবন এভাবে নিরবে সব সহ্য করে যাব? কোন দিন কাউকে কিছুই বলব না? আমার বিধাতার কাছে এতটুকুই প্রার্থনা, আমার সাথে যা হয়েছে, আর কারো সাথে যেন না হয়।

No comments:

Post a Comment